‘একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, কিন্তু স্বপ্নের দেশ পেয়েছি কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ’

 

alvi

সৈয়দ আবুল বারক আলভী ১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। পাবনা জিলা স্কুল এবং ঢাকা গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে পড়ালেখা করেছেন। এসএসসি পাস করে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। বিএফএ পাস করে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের সিনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে চলে যান। প্রশিক্ষণ নিয়ে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একপর্যায়ে ঢাকায় আলতাফ মাহমুদের বাসা থেকে তিনি পাকিস্তানি আর্মির হাতে আটক হন। সীমাহীন নির্যাতন ভোগ করে অবশেষে ছাড়া পেয়ে আবার মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। দেশ স্বাধীনের পর তিনি চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে চারুকলার অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। চারুকলায় তাঁর কার্যালয়ে বসে এই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। স্মৃতিচারণা করেছেন একাত্তরের সেই দুঃসহ দিনগুলোর। চিত্রম-এর জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান: একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ আপনি কোথায় ছিলেন?

সৈয়দ আবুল বারক আলভী : ছাব্বিশে মার্চ আমি ঢাকায় ছিলাম। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আমি বাসার বাইরে ছিলাম। আমি তখন কে এম দাস লেনে এক বন্ধুর বাসায় ছিলাম। রাত হয়ে গেলে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে আমি সেগুনবাগিচায় এসে আরেক বন্ধুর বাসায় গেলাম। ওখানে একটু রাত হওয়ার পর আবার বেরোলাম। তখন দেখি রাস্তায় ব্যারিকেড করা হয়েছে। আমি সেগুনবাগিচা থেকে বেরিয়ে আজিমপুর পর্যন্ত গেলাম। তখন শুনলাম যে একটা কিছু হচ্ছে। কিন্তু কেউ পরিষ্কার বুঝতে পারেনি যে আসলে কী হচ্ছে। তবে সামথিং রং কিছু হচ্ছে- এটা বোঝা যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে একধরনের ভয়, নীরবতা। আমি তখন থাকতাম আজিমপুর রোডে, বেবি আইসক্রিমের গলিতে। দেখলাম ওখানে ভালোমতোই ব্যারিকেড পড়েছে। দেখি নূরে আলম ভাই, তিনি তখন দৈনিক বাংলায় চাকরি করতেন, সাইকেল চালিয়ে আসছেন। আমি জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাচ্ছি। তার কাছে শুনলাম যে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মিরা বেরিয়েছে। তিনি সন্দেহ করছেন হয়তো আর্মিরা বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে যাবে, তাই তিনি বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে যাচ্ছে। দেখলাম অনেক ব্যারিকেড পড়ে গেছে। আমিও ওদিকে যাচ্ছি। সেখানে পরিচিত অনেককে পেলাম। তাদের মধ্যে কবি নির্মলেন্দু গুণও আছেন। পেছন থেকে হঠাৎ গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেল। ঠিক কোন দিক থেকে আওয়াজটা আসছে বুঝতে পারছি না। একবার মনে হচ্ছে নিউমার্কেটের দিক থেকে আসছে, আবার মনে হচ্ছে পিলখানা থেকে বা আজিমপুর কবরস্থানের দিক থেকে আসছে। তারপর আস্তে আস্তে আওয়াজ বাড়তে থাকে। জনমানুষশূন্য হয়ে গেছে রাস্তা। আর্মির কনভয়ের আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে। আমি একটা কোয়ার্টারে ঢুকে পড়লাম। তারপর যখন আওয়াজটা কমে এলো, তখন আবার বেরিয়ে চারদিকে তাকিয়ে বাসার দিকে চলে গেলাম। বাসা ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি, ওই রাস্তা দিয়েই আর্মির গাড়ি যাচ্ছে। সম্ভবত পিলখানার দিকে যাচ্ছে। তারপর তো প্রচন্ড গোলাগুলি শুরু হলো। আমার বাসা একতলার ছাদে। আমি কয়েক দিন ধরেই বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকাটা টাঙিয়ে রেখেছিলাম। ওটা যে টাঙানোই রয়েছে সেটা খেয়াল ছিল না। সাতাশ মার্চও সেটা টাঙানো ছিল। সামনের বাসা ছিল আমার বড় মামার। মামা আমাকে ডেকে পতাকাটা নামিয়ে ফেলতে বললেন।

স্বকৃত নোমান: একাত্তরের মার্চে আপনি কী করছিলেন?

আবুল বারক আলভী : আমি তখন সরকারি চাকরি করছি। ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সে। তখন সেটা সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকরি ছিল। যদিও আমি সরকারি চাকরি করছি, কিন্তু আবার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও থাকতাম। চারুকলায় পড়া অবস্থায় তো সব সময়ই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম। তখন ওই ভয়টি ছিল না- চাকরি থাকবে না চলে যাবে। সবে মাত্র ছাত্রত্ব কেটেছে। চাকরি থাকলে থাকবে, না থাকলে থাকবে না- এ রকম একটা ভাব। ছাব্বিশে মার্চে তো একটা সময় কারফিউ গেল। তারপর সবাইকে আবার জয়েন করতে বলা হলো। আমি দু-এক দিন পর জয়েন করলাম। অফিসেও সবার আলোচ্য বিষয় সার্বিক পরিস্থিতি। আমরা আলাপ করছি কী করব, কী করা যায় ইত্যাদি নিয়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা খবর আসছে। ওখানে পুড়িয়ে দিয়েছে, ওখানে মেরে ফেলা হয়েছে ইত্যাদি।

অফিসে আমার তেমন কাজের চাপ ছিল না। একটা ইলাস্ট্রেশন করলেই আমার শেষ হয়ে যেত। আর ছিল প্রচ্ছদ করা। এটা তো খুব জটিল কাজ ছিল না। বিভিন্ন সরকারি পত্রিকা বেরোত ওখান থেকে। আমাদের অফিস ছিল পুরানা পল্টনে। আমার অফিসটা ছিল মূল অফিসের পাশে।

স্বকৃত নোমান: আপনি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলেন। প্রথমে কোথায় গেলেন?

আবুল বারক আলভী: আমি যখন গেছি তখন তো মুক্তিযুদ্ধ ঠিকমতো শুরু হয়নি। সবে কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা, প্রস্তুতি চলছে। আমরাও ঠিক জানি না কোথায় গেলে কাকে পাব। আমরা সোনামুড়া দিয়ে ভারতে ঢুকি।

স্বকৃত নোমান: আপনার সঙ্গে আর কারা ছিলেন?

আবুল বারক আলভী : আমার সঙ্গে আহরার ও রূপু ছিল। রূপু হচ্ছে শবনম মোস্তারির মামা। আমরা একসঙ্গেই চাকরি করতাম। আমরা সবাই মিলে এপ্রিলে ‘রণাঙ্গন’ নামে একটা পত্রিকাও বের করেছিলাম। লাল অক্ষরে রণাঙ্গন লেখাটা ছিল। আমার খেয়াল আছে, পত্রিকা নিয়ে আমি অফিসেও যেতাম। ওখানে ছাপানো সব খবর যে সত্যি ছিল তা নয়। লোকের মুখে শোনা কিছু খবরে অতিরঞ্জিতও ছিল। মানুষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করা, ফিলিংস তৈরি, দেশাত্মবোধ তৈরির জন্য জন্য পত্রিকাটা বের করেছিলাম।

স্বকৃত নোমান: তখন তো আপনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতেন?

আবুল বারক আলভী : না, সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতাম না, কিন্তু রাজনীতি সচেতন ছিলাম। খানিকটা বামপন্থী ছিলাম। কিন্তু সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতাম না। তখন তো আশি ভাগই বামপন্থী ছিল।

তো যা-ই হোক, এসব করতে করতে একটা ইচ্ছে জেগেছিল যে কী করা যায়। কেউ কেউ বলল সোনামুড়ায় ক্যাম্প তৈরি হবে, ওখানে মুক্তিযুদ্ধের আয়োজন চলছে ইত্যাদি। বুঝলাম যে আগরতলায় গেলে অনেককে হয়তো পাওয়া যাবে, ওখানে কিছু একটা করা যাবে। আমরা চারজন একসঙ্গে রওনা দিয়েছিলাম। তখন কাঁচপুর থেকে আরম্ভ করে সব নদীতেই ফেরি। সব ফেরিঘাটেই আর্মির চেকপোস্ট। লোকজন পার হওয়ার সময় আর্মি সবাইকে চেক করছে। আমরা গুলিস্তান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে রওনা হই। চান্দিনা পেরিয়ে একটা জায়গায় নেমে আমরা একটা রিকশা নিলাম। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাব। কিন্তু আমরা কোথায় যাব তা তো আমরা নিজেরাও জানি না। রিকশাওয়ালা আমাদের মনোভাব বুঝতে পারল। জমিনের আল, মেঠোপথ, গোমতী নদী পার হয়ে আমরা সোনামুড়ায় পৌঁছলাম। ওখানে ক্যাপ্টেন আখতারকে পেলাম। তিনি আর্মির ডাক্তার ছিলেন। তিনি খালেদ মোশাররফের সঙ্গে ওখানে গিয়েছেন। ওখানে একটা বাংলো ছিল, ওখানে তিনি থাকেন এবং রোগী দেখেন। তার কাছ থেকে নানা ইনফরমেশন পেলাম। তার তথ্যমতে আমরা আগরতলায় চলে গেলাম। ওখানে একটা শরণার্থী শিবিরে গিয়ে উঠলাম। বিভিন্ন কলেজ-স্কুলের রুম খালি থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ওখানে থেকে আমরা দেশের খবর নেওয়া শুরু করলাম।

স্বকৃত নোমান: তখন আপনার বাবা-মা কোথায় ছিলেন?

আবুল বারক আলভী : ওনারা জানতেনও না যে আমি ভারতে চলে গেছি। আমি মামার সঙ্গে থাকতাম, মামাও জানতেন না আমার চলে যাওয়ার কথা। তবে আমি যাওয়ার সময় বন্ধুবান্ধবের কাছে চিঠি লিখে গিয়েছিলাম যে, আমি ভালোমতো পৌঁছেছি, তারা যেন কোনো চিন্তা না করেন। বন্ধুদের বলেছিলাম যে আমি চলে যাওয়ার দুদিন পর যেন চিঠিটা বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

স্বকৃত নোমান: যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে জড়ালেন কখন?

আবুল বারক আলভী : তখন তো আমি বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরেই থাকতাম, মেলাঘরে। দুই নম্বর সেক্টরে। মাঝে মাঝে দেশে ঢুকেছি আবার ফিরে গেছি। প্রথম দিকে তো অস্ত্রশস্ত্রও ওভাবে জোগাড় করা যায়নি। ওখান থেকে আমরা এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতাম। আগস্ট মাসে আমরা চারজন ঢুকলাম দেশে- আমি ফতেহ আলী, বাকের ও কমল। আমরা কিছু অস্ত্র নিয়ে ঢুকলাম। বিভিন্ন টিম অস্ত্র নিয়ে ঢুকছে, অস্ত্রগুলো রেখে তারা আবার ফিরে যাচ্ছে। কারণ, অস্ত্র নিয়ে একবার আসা আরেকবার যাওয়াটা বিপজ্জনক ছিল। প্রচুর অস্ত্র ঢোকা দরকার দেশে। তাই মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন কৌশলে দেশে আর্মস ঢুকাচ্ছে। আমরাও অস্ত্র বহন করে নিয়ে এসেছি। প্রচুর অস্ত্র ছিল আমাদের সঙ্গে।

স্বকৃত নোমান: আপনি তো একাত্তরে পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কোন মাসে?

আবুল বারক আলভী : আগস্ট মাসেই, শেষবার যখন অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকি। তখন আলতাফ মাহমুদের বাসা ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ঠিক উল্টো দিকে, শহীদবাগে। কোনা কোনো মুক্তিযোদ্ধা তখন তার বাসায় কিছু অস্ত্রশস্ত্র রাখতেন। আমাদের অস্ত্রগুলো রেখেছিলাম বাকেরের এক আত্মীয়ের বাসায়। বাসাটা ছিল বাড্ডার দিকে। তখন বাড্ডা ছিল পানি এলাকা। তখন বাকেরও বোধ হয় কিছু অস্ত্র আলতাফ ভাইয়ের বাসায় রেখেছিল। নিশ্চিত করে বলতে পারব না। কারণ, বাকেরের সঙ্গে আমাদের আর দেখা হয়নি পরবর্তী সময়ে। সে আর্মিদের হাতে ধরা পড়েছিল এবং তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল।

যা হোক, আগস্ট মাসে আমরা আলতাফ মাহমুদের বাসায় একসঙ্গে ধরা পড়লাম। আলতাফ ভাইকে ধরতে এসেছিল, আমি তো ওখানে থাকার কথা না। আমি যেখানে থাকি সেই বাসাও রেড হয়েছিল। অর্থাৎ ফতেহ আলীদের বাসায়, বিচিত্রার শাহাদত চৌধুরীদের বাসায়। আমার ওই বাসায়ই থাকার কথা। কিন্তু আলতাফ ভাইয়ের বাসায় এসেছিলাম এই কারণে, যেহেতু আমরা ভারতে চলে যাব, আলতাফ ভাইয়ের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমাদের সঙ্গে যেতে চাচ্ছিল। তিনি মনে হয় কোনো বিপদে ছিলেন, সে জন্য চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলেন না হয়তো। তাই এ ব্যাপারে কথা বলার জন্যই আলতাফ ভাই আমাদের ডেকেছিলেন। আলতাফ ভাই বললেন তাকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে। তা ছাড়া আলতাফ ভাইয়ের ফ্যামিলির সঙ্গে আমি খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তার স্ত্রী সারা আরা, ডাকনাম ঝিনু, যিনি বর্তমানে শিল্পকলায় আছেন। ঝিনুর সঙ্গে ছোট থেকে একসঙ্গে ছিলাম।

সে রাতে আমি বাসায় চলে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আলতাফ যেতে দিলেন না। তিনি বললেন, এখন রিকশা-গাড়ি কিছু পাবে না, বেশি বাহাদুরি দেখানো ভালো না। আলতাফ ভাইয়ের কথায় আর বাসায় ফেরা হলো না। তারপর ভোররাতে আলতাফ ভাইয়ের বাসা রেড হলো। আলতাফ ভাইকে ধরতে গিয়ে তার সঙ্গে আরও ছয়জন ইনোসেন্ট ছেলেকে ধরেছে। তাদের মধ্যে আমিও আছি। এ ছাড়া আলতাফ ভাইয়ের তিনজন শালা ছিল, তিনজনকেই ধরেছে। ঝিনুর বড় ভাইকেও ধরেছে।

স্বকৃত নোমান: আপনাকে আলভী হিসেবে ধরা হয়নি?

আবুল বারক আলভী : না, আমাকে ইনোসেন্ট হিসেবেই আটক করেছে।

স্বকৃত নোমান: আটক করে আপনাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হলো?

আবুল বারক আলভী : সবাইকেই মার্শাল ল কোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। এখন যেটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সেটা তখন অ্যাসেম্বলি ছিল। তার পাশে সংসদ সদস্যদের থাকার কোয়ার্টার যেগুলো, সেগুলোই ছিল মার্শাল ল কোয়ার্টার। ওখানে তখন দু-তিনটা বাড়ি ছিল। আমাদের একটাতে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের গাড়ি থেকে নামানো হলো। গাড়িতে ওঠানোর সময়ও বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত, বুট জুতার লাথি, কিল-ঘুষি ইত্যাদি দিয়েছিল। গাড়ি থেকে নামানোর সময়ও যে যেভাবে পারল মারধর করল। চোর ধরলে যেমন গণধোলাই চলে, ঠিক তেমনি। বিচার শুরু হওয়ার আগেও আমাদের ব্যাপক মারধর করা হলো। ওখানে কিচেন রুমের মতো একটা কক্ষ ছিল, ওখানে সবাইকে রাখা হলো। তার পাশের একটা রুমে ইন্টারোগেশন শুরু হলো। একজন একজন করে ডাকা শুরু হলো। আমার আগে কয়েকজনকে নেওয়া হলো। তারপর আলতাফ মাহমুদকে ডাকা হলো। যাকেই ডাকছে তার ওপর টর্চার হচ্ছে। কথা বের করার জন্য টর্চার চলছে। মাঝে মাঝে আমরা আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। দরজটা যখন মাঝে মাঝে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে তখন দেখতে পাচ্ছি কীভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

আলতাফ ভাইকে নেওয়ার পর আরও কয়েকজনকে নিল। তারপর একজন এসে বলল, ‘আলভী কোন?’ আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। কাউকে তো নাম ধরে ডাকা হয়নি। আমাকে নাম ধরে ডাকা হচ্ছে কেন? নানা ভাবনা আসছে মনে। একবার ভাবছি, আলতাফ ভাই বুঝি টর্চারের শিকার হয়ে আমার কথা কিছু বললেন। আবার সেটাও মনে হচ্ছে না। আলতাফ ভাইকে যে টর্চার করা হচ্ছে তার অর্ধেক শুনতে পাচ্ছি, অর্ধেক শুনতে পাচ্ছি না। তা ছাড়া আমি যে আলতাফ ভাইয়ের বাসায় অস্ত্র রেখেছিলাম, সে তথ্য আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। সে ক্ষেত্রে আলতাফ ভাই তো আমার নাম বলার কথা নয়। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক, আগ বাড়িয়ে তিনি আমার নাম বলবেন কেন? আবার ভাবছি, আমাদের আটক করে নিয়ে আসার আগে আরেকটা গ্রুপকে আনা হয়েছিল। তাদের কেউ হয়তো আমার নাম বলেছে।

‘আলভী কোন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার সঙ্গীরা আমার মুখের দিকে তাকাল। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। একটা অস্বস্তিকর অবস্থা। এটা অবশ্য স্বাভাবিকও। এ রকম মুহূর্তে নিজের অজান্তেই তাকায় সবাই। আমি বললাম, আমিই আলভী।

স্বকৃত নোমান: স্বীকার না করলেও তো পারতেন…।

আবুল বারক আলভী : হ্যাঁ, তা পারতাম। কিন্তু আমি আলভী তো এখানে আছি। আমার সঙ্গী দু-একজনকে টর্চার করলে তো হয়তো তারা আমার কথা বলেও দিতে পারে। তখন তো আমার ওপর দ্বিগুণ টর্চার হবে। তাই স্বীকার করে নেওয়াটাই সমীচীন মনে করলাম। তারপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো টর্চার সেলে।

স্বকৃত নোমান: টর্চারের ধরনটা কেমন ছিল?

আবুল বারক আলভী : মোটা বেত দিয়ে আমাকে এলোপাতাড়ি পেটাচ্ছে। আমার হাতের, গায়ের চামড়া ফেটে গেছে। হাতের আঙুলগুলো ফেটে গেছে। আমাকে বারবার মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করছে। আমি বারবার অস্বীকারই করে যাচ্ছি। কারণ, স্বীকার করলেও টর্চার যে বন্ধ হবে তা নয়। সুতরাং টর্চার চলুক, আমি স্বীকার করব না। বললাম, না, আমি কখনোই মুক্তিযুদ্ধে যাইনি। বলল, তোমার নাম আলভী তো? বললাম, হ্যাঁ, আমিই আলভী। বলল, তোমরা এত তারিখে ঢুকেছিলে। তোমাদের সঙ্গে এই এই অস্ত্র ছিল। তোমরা অমুক জায়গায় অস্ত্রগুলো রেখেছিলে।

আমি তো অবাক! সবকিছু মিলে যাচ্ছে! তখন আমি নিশ্চিত হলাম যে আমাদের কেউ ধরা পড়েছে। কারণ, আমাদের কেউ ধরা না পড়লে এ তথ্য পাওয়ার কথা না। কিন্তু কে ধরা পড়েছে বুঝতে পারছি না। ফতেহর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কমলের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তারা ধরা পড়েনি আমি জানি। শুধু বাকেরের সঙ্গে দেখা হয়নি।

তো আমি বললাম, না, আমি মুক্তিযুদ্ধেই কখনো যাইনি। তার পরও প্রশ্ন করছে, তোমার এই এই বন্ধুরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে। বললাম, কারা আমার বন্ধু? তখন আমার অনেক বন্ধুর নাম বলল। আমি বললাম, না, এই নামে আমার কোনো বন্ধু নেই। বলল, তুমি ভাবছ অস্বীকার করলেই তুমি ছাড়া পেয়ে যাবে? আমি কিছু বলছি না।

খানিক পরে একজনকে নিয়ে আসল। সে আমার বন্ধু বাকের। তার সারা শরীর রক্তাক্ত। তাকে জিজ্ঞেস করল, এ কি আলভী? বাকের আমার দিকে করুণভাবে তাকাল। তাকিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। কারণ, তার তখন কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। আমিই যে আলভী, বাকের এ কথা যে স্বীকার করেছে- এ জন্য আমি বাকেরকে দোষ দেই না। কারণ, সে তো জানে না আমি কখন ধরা পড়েছি, আমি যেমন জানি না সে কখন ধরা পড়েছে। আমি স্বীকার করেছি কি করিনি, সে তো জানে না।

যা হোক, আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাকেরের ব্যাপারে। আমি বললাম, না, আমি বাকেরকে চিনি না। হয় সে ভুল করছে, নয়তো ইচ্ছেকৃতভাবে আমাকে ফাঁসাচ্ছে। আমি কখনো তাকে দেখিনি, চিনিও না। তারপর আমাকে অন্যরুমে টর্চার করতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। হাতের নখগুলো একটা যন্ত্র দিয়ে টেনে ধরছে, আগের মতোই বেত দিয়ে পেটাচ্ছে। নখ বেয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমি তো কোনো কিছু স্বীকার করিনি। সুতরাং রিপোর্টে তো আমার নামটা ছাড়া আর কিছু লেখার কথা না। আমার নাম লিখলে শুধু আলভীই লিখবে। আবার এমনও হতে পারে, যখন লিখতে বসবে তখন রিপোর্টটা নাও থাকতে পারে। টর্চারটা খুবই নির্মম। সেই সঙ্গে অশ্লীল গালাগালি চলছে। আমি এসব গালাগালি শুনে অভ্যস্ত না। তাই আমার মাথায় জেদ চেপে গিয়েছিল যে, যতই নির্যাতন করুক, আমি স্বীকার করব না।

তারপর অনেক রাতে আমাদের রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে বিচিত্র ধরনের আসামি আছে। চোর-ডাকাত-পকেটমার ইত্যাদি। কিছু অফিশিয়াল আসামিও আছে। হয়তো সন্দেহ করেছে তাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্ক আছে। অথবা আওয়ামী লিগার বলে সন্দেহ করেছে।

এটা আমার মাথায় ছিল যে, আমাকে ছাড়া পেতে হলে আলতাফ ভাইয়ের গেস্ট আমি- এটা এস্টাবলিস্ট করতে হবে। অর্থাৎ আমি আলতাফ ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গেছি, সেখান থেকে আমাকে ধরা হয়েছে। আলতাফ ভাইকে সে কথা বললাম। বললাম যে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনিও যেন একথাই বলেন। নাম লিস্ট করার সময় আমাকে নাম জিজ্ঞেস করা হলো। একবার ভেবেছিলাম নাম পাল্টাব। পরে ভাবলাম, নাম পাল্টালে আবার নতুন বিপদে পড়ে যাব হয়তো। তাই বুদ্ধি করে নাম বললাম সৈয়দ আবুল বারক। আলভীটা বাদ দিয়ে দিলাম। আলতাফ ভাইকেও এই নামের কথা জানালাম। আমাকে যখন টর্চার করা হচ্ছিল, তখন খেয়াল করেছিলাম যে ওই সিপাহি রাগের চোটে কোনো একটা কাগজ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। ভাবছি, ওই কাগজেই হয়তো আমার নাম লেখা ছিল। সুতরাং আলভী নামটা বাদ দেওয়াতে তেমন অসুবিধা হবে না বলে ভাবছি। আলতাফ ভাইকে আমার বাবা-মায়ের নাম জানিয়ে দিলাম, জেনে নিলাম তার বাবা-মায়ের নামও। কারণ, আমি যদি আলতাফ ভাইয়ের আত্মীয় বলে পরিচয় দেই, তখন যদি আমাকে তার বাব-মায়ের নাম জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে তো বিপদে পড়ে যাব। তাই পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম।

স্বকৃত নোমান: থানা থেকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হলো?

আবুল বারক আলভী : পরদিন সকালে আমাদের আবার মার্শাল ল কোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। কাল যে কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে নয়, পাশের আরেকটা কোয়ার্টারে। একজন একজন করে ডাকা হচ্ছে। আগে ছিল একজন, এবার তিন-চারজন অফিসার। সবাইকে ডাকা হলো, আলতাফ ভাইকেও ডাকা হলো, কিন্তু দেখলাম আমাকে আর ডাকা হচ্ছে না।

স্বকৃত নোমান: আপনি ভাবছেন, হয়তো আপনাকে পরে আলাদাভাবে গুরুতর কোনো শাস্তি দেওয়া হবে, এ জন্য এখন ডাকছে না…?

আবুল বারক আলভী : না, আমাকে না ডাকাতে আমি নিশ্চিত হলাম যে আমার রিপোর্ট নেই। গতকাল যে সিপাহি রাগের চোটে যে কাগজটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল সেটিই ছিল আমার রিপোর্ট, আমি নিশ্চিত হলাম এ ব্যাপারে। যে সিপাহি নাম ধরে ডাকছিল আমি তাকে বললাম যে, আমাকেও তো উনাদের সঙ্গে ধরা হয়েছিল, কিন্তু আমাকে ডাকা হচ্ছে না কেন? আলতাফ ভাইকে জিজ্ঞেস করা হলো আমার কথা সত্যি কি না। আলতাফ ভাই বললেন, হ্যাঁ, আমাকেও ধরা হয়েছিল। জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী? বললাম, সৈয়দ আবুল বারক। বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, আসো।

আমাকে টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হলো। এখানেও নির্যাতন চালানো হলো। তবে গতকালের মতো না। একপর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। আমি আলতাফ ভাইয়ের বাসায় অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম সে কথা বললাম। আমার হাত দুটো ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। সারা গা ফেটে রক্তাক্ত, বীভৎস। দেখলাম দুজন অফিসার নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বলাবলি করছে। তাদের চেহারা দেখে আমি বুঝতে পারছি, তাদের মধ্যে হয়তো কোনো সিম্পেথি জন্মেছে আমার ব্যাপারে। একজন অফিসার জিজ্ঞেস করল, তোমাকে কেন ধরল? বললাম, আলতাফ ভাইয়ের বাসায় আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে আমাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। অফিসার আলতাফ ভাইকে জিজ্ঞেস করল কথাটা সত্যি কি না। আলতাফ ভাই তাই বললেন। অফিসার বলল, আচ্ছা, তোমার বয়সী সবাই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে, তুমি যাওনি একথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলো কেন? বললাম, দেখেন, আমি সরকারি চাকরি করি, আমি কেন মুক্তিযুদ্ধে যাব?

: কোথায় চাকরি করো?

: ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সে।

: ঠিক আছে, তোমার অফিসের টেলিফোন নম্বর দাও।

আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম নিজের অতি সাহসের জন্য। একটু থমকে গেলাম। তারপর অফিসের টেলিফোন নম্বরটি বললাম। তখন সরকারি অফিসে দু-তিনটির বেশি টেলিফোন থাকত না। আমি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের টেলিফোন নম্বরটা দিলাম। অফিসার রিং শুরু করল, কিন্তু কী মনে করে আর ফোন করল না। প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে সাহস ফিরে পাই। কারণ এটা আমার জানা ছিল যে, যিনি টেলিফোনটা ধরবেন তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে আমি নাই। কারণ আমি আর কবি তালিম হোসেন যে ভারতে চলে গেছি তিনি তা জানেন। কিন্তু সেটা তিনি বলবেন না। তা ছাড়া রূপু ছিল তার শালা; যে আমার সঙ্গে গিয়েছিল। সুতরাং তিনি স্বীকার করবেন না যে আমরা মুক্তিযুদ্ধে গেছি। তিনি বলবেন, আজ আমি অফিসে যাইনি। আমি যে অফিসে যাইনি সেটা তো সত্যি কথা। আমি যে আটক হয়েছি, সেটা তো অফিসারই দেখতে পাচ্ছেন।

তারপর আমাকে লোভ দেখানো হলো যে, তুমি যদি তোমার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের নাম বলো তবে ছাড়া পাবে, নয়তো ছাড়া পাবে না। আমি বললাম, আমি সরকারি চাকরি করছি। যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছে তারা হয়তো আমার বন্ধু হতে পারে। কিন্তু তারা কি আমাকে বলবে যে আমি মুক্তিযুদ্ধে গেছি। কারণ, সরকারি চাকরিজীবীদের তো তারা দালাল ভাবে।

তখন মানসিকভাবে খুব দুর্বল মুহূর্ত। মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। পাকিস্তানি আর্মিদের নির্যাতনের সময় সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছে মায়ের কথা। সব সময় মনে হয়েছে, পৃথিবীতে মা ছাড়া আর কিছু নাই। খারাপ হোক ভালো হোক, মা তো মা-ই।

দেখলাম, আগের দিন টর্চারের সময় যে সুবেদার মেজর ছিল সে এসে পেছনে দাঁড়াল। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল। এতক্ষণ একজনের কাছে নিজেকে নির্দোষ বলে প্রমাণ করলাম, এখন আরেকজন এসে পড়ল! এবার বুঝি আর রক্ষা নাই। সুবেদার মেজর যে নিষ্ঠুর ছিল তা নয়। গতকাল যখন আমাকে টর্চার করা হচ্ছিল তখন এই সে মাঝেমধ্যে এসে ওই নির্যাতনকারী সিপাহিটাকে বলছিল, ‘ইয়ে তো বাচ্চা হ্যায়, ইয়ে তো মর যায়ে গা, মত মার’। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পর আবার মারা হচ্ছিল আমাকে। তাই এটাও মনে হচ্ছিল যে, লোকটা হয়তো খারাপ না। হয়তো তার কোনো সিম্পেথি কাজ করেছে আমার ওপর। হয়তো তার ছেলের সঙ্গে আমার চেহারার মিল রয়েছে। যা হোক, মেজর কিছু বলল না। আমি যে কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করছি তাতেও তিনি কিছু বলল না।

তারপর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। ইনোসেন্ট যাদের ধরা হয়েছিল তাদেরও ছেড়ে দিল। আমি গেটে গিয়ে দেখলাম যে সিপাহিটা গতকাল আমাকে বলেছিল, ‘তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি কীভাবে ছাড়া পাও আমি দেখব’, সে গেটে দাঁড়ানো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম তাকে দেখে। এই সিপাহিটা তো বলে দেবে আমি যে আলভী। সব বুঝি এবার পন্ড হয়ে যাবে! তখন আমি ওই মেজরকে বললাম, আমি তো হাঁটতে পারছি না, আমি কীভাবে যাব? তখন সে আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করল এবং একজন সিপাহিকে বলল আমাকে গেট পার করিয়ে দিয়ে আসতে। সিপাহি আমাকে গেট পার করে দিয়ে এলো।

স্বকৃত নোমান: তারপর কোথায় গেলেন?

আবুল বারক আলভী : তারপর আমি এয়ারপোর্ট রোডে উঠে এলাম। এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে তখন একটা গাড়ি রাস্তা ক্রস করে চলে গেল। গাড়িটি সামনে গিয়ে আবার পেছনে এলো। আমি একটু ঘাবড়ে যাই। কে এলো আবার! গাড়ি থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন তাকে আমি চিনি। নিমা রহমানের বাবা। তার বাসা থেকে কিছুদিন আগে আমি শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলাম। যেহেতু মুস্তাফা মনোয়ার মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন, তাই তার স্ত্রীকে আর্মিরা খুঁজছিল। নিমার বড় ভাই রানা হচ্ছে আমাদের বন্ধু। ভদ্রলোক আমাকে গাড়িতে তুলে নিলেন। আমি বললাম আমাকে যেন আলতাফ মাহমুদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। কারণ তখন ওই বাসায় যাওয়াটাই নিরাপদ। কেউ যদি আবার আমাকে ফলো করে পেছন থেকে। সুতরাং যেখান থেকে ধরা পড়েছি সেখানে যাওয়াটাই সমীচীন মনে করলাম। সন্ধ্যা হলে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে দরকার হলে অন্যত্র চলে যাব।

স্বকৃত নোমান: কত দিন পর আবার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন?

আবুল বারক আলভী : আমি এক মাস ঢাকায় ছিলাম। বিভিন্ন বন্ধুর বাসায় থাকতাম। একজনের বাসায় পাঁচ-ছয় দিনের বেশি থাকতাম না। তখন আমার মুক্তিযুদ্ধে গিয়েও কোনো লাভ নেই। কারণ হাতটা একেবারেই নাড়াতে পারছি না। হাতের আঙুলগুলো বাঁকা করে ভাত খেতে পারি না। ভাত চিবুতে পারি না মুখের ব্যথার কারণে। সবাই ভেবেছিল আমাকে বুঝি মেরে ফেলা হয়েছে।

তারপর আমি আবার মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলাম। সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরীও তখন ওখানে। একসঙ্গেই থাকতাম আমরা। কিন্তু আমাকে আর এপারে পাঠানো হয়নি। কারণ একবার ধরা পড়ে গেছি, আবার ধরা পড়লে তো রক্ষা থাকবে না। আমার ফটোগ্রাফির একটা ঝোঁক ছিল তখন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার তোলা ছবি ছাপা হতো। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো যুদ্ধের ফ্রন্ট সাইডে থেকে ছবি তোলার। আমি খালেদ মোশাররফের সঙ্গে থেকে যুদ্ধের ছবি তুলতে শুরু করলাম। একদিন এ রকম এক যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ছে। একটা ডোবার মাটি উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র, মাটিগুলো এসে আমাদের ওপর পড়ছে। সেখানে সেদিন আমার ক্যামেরাটা নষ্ট হয়ে গেল। কাদামাটিতে একেবারে জ্যাম হয়ে গেল। আগরতলাতে কোনো দোকান নেই এই ক্যামেরা সারানোর মতো। ফলে আমার ছবি তোলা হলো না আর।

স্বকৃত নোমান: একাত্তরে নানা নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করলেন, সংগ্রামবিক্ষুব্ধ সময় অতিক্রম করলেন, সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়ালেন। যে স্বপ্নের দেশের জন্য এত কিছু করলেন, সেই স্বপ্নের দেশ কি পেলেন? মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পর আপনার কী মনে হয়?

আবুল বারক আলভী : একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, কিন্তু স্বপ্নের দেশ পেয়েছি কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। এত বছর পার হয়ে গেল, স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় এলো একটা পর্যায়ে। জাহানারা ইমাম ছাড়া আর কেউ সক্রিয়ভাবে এসব যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে দাঁড়াল না। যুদ্ধাপরাধীরা একটা সময়ে হিরো হলো, মন্ত্রী হলো, দেশের একটা অংশ তাদের সাপোর্ট দিল- এটা ভাবতে খুব কষ্ট লাগে।

স্বকৃত নোমান: এই দেশ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

আবুল বারক আলভী : ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে সবাই যদি একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তবে এ দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এখন কিন্তু মানুষ অনেক সচেতন। আশা করছি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও সচেতন হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়কাল : ২০১১

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »